এক মাসেরও বেশি সময় ধরে প্রচার, সমাবেশে জড়ো হতে আপ্রাণ চেষ্টা। নির্ধারিত সময়ের দুই দিন আগে থেকেই জড়ো হওয়া, শেষ পর্যন্ত বিরাট জমায়েত। তবে শনিবারের সমাবেশ নিয়ে বিএনপিতে যত উচ্ছ্বাস, তার চেয়ে হতাশা, ক্ষোভও কম নয়।
কান্দিরপাড়ে টাউনহলে সমাবেশ শেষে এখন তুমুল আলোচনা মঞ্চের বিশৃঙ্খলা নিয়ে। সমাবেশ স্থলে এসেও ফিরে গেছেন সাবেক শিক্ষামন্ত্রী এহসানুল হক মিলন। যারা বক্তব্য রাখবেন, সেই তালিকায় ছিল না ভাইস চেয়ারম্যান শওকত মাহমুদের নাম। বক্তব্য না রাখতে পেরে দলটির বেশ কয়েকজন নেতা ক্ষোভও প্রকাশ করেন।
মঞ্চজুড়ে সেদিন ছিল সেলফি তোলার হিড়িক, একের পর এক ফোন চুরি। এমন বিশৃঙ্খলায় বিরক্ত কেন্দ্রীয় নেতারাও।
শনিবার বেলা ১১ টায় ধর্মগ্রন্থ পাঠের মাধ্যমে সমাবেশ শুরু হয়। মঞ্চে উঠেন কুমিল্লা, চাঁদপুর ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কয়েকজন নেতা। তাদের সঙ্গে উঠে পড়েন অর্ধশত কর্মীও।
ভিড় সামাল দিতে এগিয়ে আসেন কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান বরকত উল্লাহ বুলু। মঞ্চের মধ্যেই স্থানীয় নেতা রেজাউল ইসলাম তার সঙ্গে বাকবিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়েন। তাদের মধ্যে হাতাহাতির ঘটনাও ঘটে।
আয়োজকদের ভুলে বক্তব্যর তালিকায় ছিলেন না কুমিল্লার সন্তান শওকত মাহমুদের। অবশ্য তিনি জানতে পেরে সমাবেশে যাননি।
আগের দিন দুপুরে কয়েক হাজার নেতাকর্মী নিয়ে কুমিল্লায় আসেন সাবেক শিক্ষামন্ত্রী এহসানুল হক মিলন। বেলা সাড়ে ১২ টার দিকে তিনি যান মঞ্চের সামনে। কিন্তু মঞ্চে উঠতে পারেননি। ক্ষোভে ফিরে যান সেখান থেকে।
চাঁদপুর থেকে আসা একাধিক কর্মী বলেন, সমাবেশে বক্তার তালিকায় নাম না থাকায় তাদের নেতা কর্মীদেরকে নিয়ে ফিরে যান।
মঞ্চে বসেও বক্তব্য না দিতে পেরে ক্ষোভ প্রকাশ করেন সাবেক সংসদ সদস্য আবদুল গফুর ভুঁইয়া ও আনোয়ারুল আজিমও।
সমাবেশের পুরো সময়টাতে মঞ্চে কোনো শৃঙ্খলাই ছিল না। অবস্থা এমন হয়েছে যে, কর্মীদের কারণে নেতাদের চেহারাও ভালো করে দেখা যায়নি। তাদের মধ্যে অনেকেই ব্যস্ত ছিলেন ছবি ও সেলফি তোলা নিয়ে।
এ সময় বিরক্ত প্রকাশ করেন দলটির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক রুমিন ফারহানা। এক কর্মী প্রায় গা ঘেঁষে সেলফি তোলায় রেগে ওই কর্মীকে সাবধানও করেন তিনি। আগের রাতে সমাবেশস্থল থেকে রুমিনের মোবাইল ফোনটি খোয়া যাওয়া নিয়ে এমনিতেই তিনি ছিলেন বিরক্ত।
কুমিল্লা জেলা দক্ষিণ বিএনপির সদস্যসচিব জসিম উদ্দিন বলেন, ৭০ ফুট দৈর্ঘ্য ও ৩০ ফুট প্রস্থের ওই মঞ্চে কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে থাকবেন বিএনপির পাঁচ সাংগঠনিক ইউনিটের জ্যেষ্ঠ নেতারা। সে লক্ষ্যে ৭০ টি চেয়ার রাখা হয়েছিল। অন্যান্য বিভাগীয় গণসমাবেশের মতোই কুমিল্লাতেও খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের জন্য চেয়ার ফাঁকা রাখা ছিল। তবে মঞ্চে এত লোক আসবে ভাবতেও পারি নাই।
বিএনপি নেতা জসিম যখন কথাগুলো বলছিলেন, সে সময় মঞ্চে উপস্থিত ছিল সাড়ে তিন শর বেশি কর্মী।
বেলা ২ টার দিকে মঞ্চের উঠার সিঁড়িতে দলটির কর্মীদের ভিড় সামাল দিতে হিমশিম অবস্থা তৈরি হয় স্বেচ্ছাসেবক ও জ্যেষ্ঠ নেতাদের।
নাম না প্রকাশ করার শর্তে এক স্বেচ্ছাসেবক বলেন, আমরা চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছি। এ সময় অনেককেই দেখা গেছে মঞ্চে দুপুরের খাবার খাওয়া নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করতে।
বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর মঞ্চে আসার কিছুক্ষণ পরই সংবাদ সংগ্রহে আসা দুই গণমাধ্যমকর্মীর সঙ্গে অসদাচারণ করেন মহানগর বিএনপির এক কর্মী। তিনি গালাগালের পাশাপাশি ওই দুই সাংবাদিকের ওপর হাত তোলার চেষ্টাও করেন। অন্য সাংবাদিকরা বিষয়টি নিয়ে প্রতিবাদ জানালে দুই পক্ষের মধ্যে বাকবিতণ্ডার সৃষ্টি হয়।
দলের শীর্ষ নেতারা যখন বক্তব্য রাখছিলেন, তখন বেশিরভাগ কর্মী ও স্বেচ্ছাসেবককে অন্য নেতাদের সঙ্গে ছবি ও সেলফি তুলতে ব্যস্ত থাকতে দেখা গেছে। মঞ্চে ওঠার সময় মির্জা ফখরুলকেও ঘিরে ধরেন শতাধিক সেলফিপ্রত্যাশী।
মঞ্চের এই চিত্র দেখে বিরক্তি প্রকাশ করেন বিএনপি মহাসচিব। যারা দায়িত্বে ছিলেন তাদের প্রতি ক্ষোভও ঝাড়েন তিনি। মঞ্চে শৃঙ্খলা আনতে ব্যর্থ হয়ে রাগান্বিত হয়ে উঠেন দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেনও।
বিএনপির কুমিল্লা বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মোস্তাক মিয়া বলেন, সমাবেশে কারা বক্তব্য দেবেন, কাদের জন্য চেয়ার রাখা হবে সেই নির্দেশনা দেয়া ছিল কেন্দ্র থেকেই। সে তালিকায় নাম ছিল না সাবেক শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী এহসানুল হক মিলন ও দলটির ভাইস চেয়ারম্যান শওকত মাহমুদের।
কেন তাদের নাম রাখা হয়নি- এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, এটা দলের সিদ্ধান্ত। এর বেশি আমি কিছু বলতে পারব না।
বিশৃঙ্খলার বিষয়টি স্বীকার করে মোস্তাক বলেন, কিছু উচ্ছৃঙ্খল পোলাপান আছে। সেলফি তুলে ফেসবুকে দেয়ার জন্য তারা মঞ্চে হুমড়ি খেয়ে পড়েছে। এখানে আমাদের আরও সতর্ক হওয়ার দরকার ছিল।
http://dlvr.it/SdRZ6w


0 Comments